মাগুরাসহ অন্য দরিদ্র জেলাগুলোর উন্নয়ন যেভাবে সম্ভব

অর্থনীতি মাগুরা সদর

মাগুরা সংবাদ:

দরিদ্র জেলাগুলোর উন্নয়ন যেভাবে সম্ভব
কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ধনী-গরিব জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসকরণকে বুঝে থাকি। উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আয়ের সুষম বণ্টন সম্ভব হয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং আয়স্তর ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির মাধ্যমে স্হবিরতা হ্রাস পায়। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেলেও দেশের বিপুলসংখ্যক অধিবাসী এখনো দরিদ্রসীমার নিচে অবস্থান করছেন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনো মৌলিক চাহিদাগুলোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রয়েছে খাদ্য ও বাসস্থানের সমস্যা। এছাড়া শিক্ষা, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা, বিদু্যত্ ইত্যাদির স্বল্পতা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র জেলাগুলো হলো—কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, মাগুড়া, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, শরীয়তপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী ইত্যাদি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা, জীবিকা ও কর্মস্থানের সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, পণ্য বিপণন ও বিক্রয়ের লিংকেজের সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি এই অঞ্চলগুলোতে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। জেলাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে আরো দেখা যায়, স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অঞ্চলগুলোতে প্রবাসীগণের সংখ্যা কম এবং স্থানীয় প্রবাসীগণের মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় শ্রমিক শ্রেণির জনগোষ্ঠী অবস্থান করছেন। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ কম হচ্ছে। বাংলাদেশের দরিদ্র অঞ্চল, দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও দারিদ্র্য হ্রাস অথবা বিমোচনের জন্য তিনটি দরিদ্র জেলা কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও মাগুরার দিকে আলোকপাত এবং দারিদ্র্য হ্রাস ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাবলম্বী অথবা অভাব মোচনের জন্য কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন।

প্রথমে আলোচনা করা যাক বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র জেলা কুড়িগ্রাম প্রসঙ্গে। এ জেলার ৭০ দশমিক ৮৭ শতাংশ জনগণ দরিদ্রসীমার নিচে অবস্থান করছে। কুড়িগ্রাম জেলায় নদীর সংখ্যা ১৬টিরও বেশি এবং প্রায় ৬০ শতাংশ জনগণের নিজস্ব কোনো জমি নেই। জেলার অধিবাসীদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ শ্রমিক এবং ৩৭ শতাংশ জনগণ দিনমজুর। জেলায় উপজেলার সংখ্যা ৯টি এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর হার ৫৬ শতাংশ। এই জেলার যোগাযোগব্যবস্থা তেমন উন্নত নয় এবং চরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা দুর্গম। এই জেলার চরাঞ্চলে সব ধরনের ফসল উৎপাদন হয় না এবং শহরের সঙ্গে চরের যোগাযোগ ভালো নয়। কুড়িগ্রাম জেলায় নির্দিষ্ট বেতন পাওয়া কর্মকর্তা অথবা কর্মচারীর সংখ্যা মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। সুষ্ঠু পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা আছে প্রায় ৩৬ শতাংশ জনগণের। এই জেলার প্রবাসীর সংখ্যা অনেক কম এবং শিল্পকারখানা তেমন নেই। জেলার অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ কম হওয়ার ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অর্থের বণ্টন কম। অল্প বয়সে উপার্জনে অংশগ্রহণ করার ফলে স্কুলগামী ছাত্রের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে থাকে। পার্শ্ববর্তী নীলফামারী জেলায় ইপিজেড প্রতিষ্ঠার ফলে আর্থসামাজিক অবকাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে। পার্শ্ববর্তী নীলফামারী জেলার ইপিজেডে মোট ২৮ হাজার কর্মচারী ১৮০টি ইন্ডাস্ট্রির পার্কে নিয়োজিত রয়েছেন।

এবার আসা যাক দিনাজপুর জেলা প্রসঙ্গে। এই জেলার জনসংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর হার প্রায় ৮৫ দশমিক ৫ শতাংশ। জেলার দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে প্রায় ৬৫ শতাংশ জনগণ। অতিদরিদ্রের হার ২৬ দশমিক ৩ শতাংশ। দিনাজপুর জেলায় পয়োনিষ্কাশনের সুবিধার আওতায় আছে ৮১ শতাংশ জনগণ। মোট জনগণের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের শ্রমিকের সংখ্যা বেশি এবং বেতনভুক্ত কর্মকর্তা অথবা কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। দিনাজপুরের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। এর প্রায় ৯০ শতাংশ জনগণ কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জড়িত। এ জেলায় প্রবাসীর সংখ্যা কম। কৃষিতে এখনো অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো প্রযুক্তিতে চাষাবাদ করা হয়। বড় পরিসরে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করার মতো অধিবাসী এ জেলায় কম।

এবার আসা যাক মাগুরা জেলা প্রসঙ্গে। মাগুরা জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ২০ হাজার, শিক্ষার হার ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৬ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন প্রায় ৫৮ শতাংশ জনগণ। অন্যান্য জেলার তুলনায় মাগুরা জেলায় প্রবাসীর সংখ্যা কম। এই জেলায় এআর জুট মিলস লিমিটেড ছাড়া বড় কোনো শিল্পকারখানা নেই। মাগুরা জেলার অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। মত্স্য খামার কম। বড় ধরনের বিনিয়োগের অভাবে এবং অর্থের প্রবাহ কম থাকার কারণে, এছাড়া দরিদ্র অঞ্চল হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে স্হবিরতা পরিলক্ষিত হয়।

কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও মাগুড়া জেলার দিকে আলোকপাত করলে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে মিল পাওয়া যায়। প্রথমত, তিনটি জেলার অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। দ্বিতীয়ত, শ্রমিক শ্রেণির জনগণের আধিক্য। তৃতীয়ত, জেলা তিনটিই শিল্পে অনুন্নত। বৃহত্ মিল-কারখানা তেমন দেখা যায় না। ফলে কর্মসংস্থানের অভাবে বেকার ও কর্মহীন লোকের আধিক্য পরিলক্ষিত হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বৃহত্ বিনিয়োগের অভাবে অর্থনীতিতে স্হবিরতা দেখা যায়। চতুর্থত, জেলাগুলোতে প্রবাসীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম এবং জেলাগুলোর প্রবাসীগণ মূলত শ্রমিক শ্রেণির এবং প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। এসব কারণে জেলাগুলোতে অর্থের প্রবাহ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তুলনামূলকভাবে কম। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যদি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, জাপান প্রভৃতি দেশের প্রবাসীগণ প্রচুর পরিমাণ রেমিটেন্স পাঠিয়ে থাকেন অথবা বৃহত্ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোনো জেলার অধিবাসীগণের অনেকের আয়স্তর বৃদ্ধি পায়, তবে সেই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়। ধনী অধিবাসীগণের চাহিদা অনুযায়ী বড় শপিংমল, বৃহত্ পরিসরের দোকান, মানসম্পন্ন রেস্টুরেন্ট, মিষ্টির দোকান ইত্যাদি বৃদ্ধি পায়। এর ফলে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় এবং দরিদ্র শ্রেণির মধ্যে অর্থের বণ্টন হয়ে থাকে এবং দরিদ্র শ্রেণির অর্থনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব হয়।

ভারতের সেভেন সিস্টারের চাহিদা সামনে রেখে কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে। এছাড়া মত্স্য খামার, হাস-মুরগির খামার, গবাদি পশুজাত শিল্প গড়ে উঠতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ, ভতু‌র্কি ইত্যাদি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, মত্স্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সফল হওয়ার সম্ভাবনা এই অঞ্চলে রয়েছে। এছাড়া কুড়িগ্রামের বালু কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে। জেলাগুলোতে কৃত্রিমভাবে মধু উৎপাদন করা সম্ভব। জৈব সার উৎপাদন, জুট মিল প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি ও ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন বিশেষ করে চরাঞ্চলগুলোর সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন প্রয়োজন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লিংকেজ বৃদ্ধি করা দরকার। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প বিকাশে এই জেলাগুলোতে বিসিক ভূমিকা রাখতে পারে। এলাকাগুলোতে বিনিয়োগের খাত চিহ্নিত করে ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ করানো সম্ভব হলে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং দারিদ্র্য হ্রাস পাবে। এই অঞ্চলগুলোতে উৎপাদিত ভুট্টা দিয়ে ভুট্টা নির্মিত খাবারের ফ্যাক্টরি হতে পারে। কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, সুলভমূল্যে সার ইত্যাদির পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই অঞ্চলের দরিদ্র জনগণের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ভাতা বাড়ানো প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটি বৃহত্ অংশ মুসলিম হওয়ার ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ধনী মুসলিমদের কাছ থেকে স্বেচ্ছায় সরকারি অথবা বেসরকারি উদ্যোগে জাকাত গ্রহণ করে এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিতরণ করা যেতে পারে। সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে দেশের বৃহত্ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো দরিদ্র জেলাগুলোতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সহায়তা প্রদান করতে পারে। (উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এবি লিমিটেড কুড়িগ্রাম জেলার দরিদ্র জনগণের মধ্যে চাল বিতরণ করছে) শিক্ষার হার বাড়ানো অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন। তিস্তা নদীর ওপর হরিপুর-কুড়িগ্রাম-চিলমারী সেতু নির্মিত হলে কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার আর্থসামাজিক অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হবে আশা করা যায়। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং এর সফল বাস্তবায়ন প্রয়োজন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন করা সম্ভব হলে তবেই হবে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন।

লেখক: অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *