মাগুরায় মহম্মদপুর থেকে কোলের সন্তান কেড়ে নিয়ে হত্যা করা হয় হেলেনাকে

মাগুরা সদর

 

মাগুরা সংবাদ:

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী দেশের অসংখ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকদের চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করে। চূড়ান্ত বিজয়ের প্রাক্কালে থাকায় স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করতে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাযজ্ঞ সংগঠিত হয়।

এমনই একজন বাম নেত্রী লুৎফুন নাহার হেলেনা। দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে কোল থেকে কেড়ে নিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় একাত্তরের ৫ অক্টোবরের রাতে।

সেদিন ছিল পবিত্র শবে বরাত। ওই রাতে পাকিস্তানি সেনারা অমানবিক ও নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে লুৎফুন নাহার হেলেনাকে। রাজাকাররা তাঁকে মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার এক গ্রাম থেকে শিশুপুত্রসহ দিনের বেলা আটক করে। পরে মাগুরা শহরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। হত্যার পর পাকিস্তানি সেনারা তাঁর মরদেহ জিপের পেছনে বেঁধে টেনে নিয়ে যায় শহরের অদূরে নবগঙ্গা নদীর ডাইভারশন ক্যানেলে। ওই ক্যানেলে তাঁর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ ফেলে দেয়।

মর্মান্তিক এ ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় তাঁর স্বামী আলী কদরের রচনায়। তিনি লিখেছেন, ‘হেলেনের মৃত্যুঘটনা ছিল করুণ ও মর্মান্তিক। […] মহম্মদপুর থানার এক গ্রামে অবস্থানকালে রাজাকার ও ঘাতক দালালদের গুপ্তচরের সহায়তায় হেলেন ২ বছর ৫ মাস বয়স্ক শিশু পুত্র দিলীরসহ রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে গেলে তাকে তারা সরাসরি নিয়ে আসে মাগুরা শহরে। এরপর পাকিস্থান বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে তাকে সোপর্দ করা হয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। হেলেনের এই দুঃসংবাদে তার বৃদ্ধ পিতা ও কতিপয় আত্মীয়স্বজন দুগ্ধপোষ্য শিশুর মাতা হেলেনের মুক্তির জন্য শত অনুরোধ সত্ত্বেও জামাতপন্থি ঘাতক দালালরা তার মুক্তির ব্যাপারে সব চাইতে বেশি বাধা সৃষ্টি করে। আলোচনায় পাকবাহিনী কর্মকর্তাকে জানায় যে, হেলেন মাগুরার বামপন্থি নেতা মাহফুজুল হক সাহেবের বোন এবং মহম্মদপুর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের বাহিনী প্রধান বামপন্থি নেতা আলী কদরের স্ত্রী। সুতরাং তার মুক্তির প্রশ্নই ওঠে না। ‘…হেলেনের মৃত্যু হয় ১৯৭১-এর ৫ অক্টোবর রাত্রিবেলায়। ঐ রাত ছিল সকল মুসলমানদের এক পবিত্র রাত শব-ই-বরাত। ঐ রাতেই তারা হেলেনের শিশু পুত্র দিলীরের করুণ-কান্নাকে উপেক্ষা করে তাকে মায়ের কোল থেকে বিচ্ছিন্ন করে পাঠিয়ে দেয় নানা বাড়িতে। তারপর অমানবিক নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে হেলেনকে।’ (স্মৃতিঃ ১৯৭১, অষ্টম খণ্ড, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৫, সম্পাদনা রশীদ হায়দার)।

লুৎফুন নাহার হেলেনার জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর মাগুরা শহরে। বাবা মুহাম্মদ ফজলুল হক। মা মোসাম্মৎ ছফুরা খাতুন। তাঁরা ছিলেন পাঁচ ভাই ও নয় বোন। বোনদের মধ্যে তিনি ছিলেন ষষ্ঠ। তিনি মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। বাবার হাত ধরে পান বই পড়ার অভ্যেস। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নানা ধরনের বই পড়ে তাঁর জ্ঞান ও চেতনার বিকাশ ঘটান তিনি। ১৯৬৮ সালে বিএ পাস করে মাগুরা গার্লস হাইস্কুলে (বর্তমানে সরকারি গার্লস হাইস্কুল) সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি মাগুরার বাম রাজনীতিতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.