হেলিকপ্টার দেখিয়ে মাগুরাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন কাড়িকাড়ি টাকা!

বাংলাদেশ

 

মাগুরা সংবাদ :

এইট পাস রুবেল হেলিকপ্টারে ঘুরে বেড়ান৷ ক্যানাডিয়ান এনজিওতে চাকরি করেন বলে গরিব মানুষকে বাড়ি করে দেয়া, এলাকায় বাঁধ তৈরি করে দেয়াসহ অনেক রকমের আশ্বাস দিয়ে কোটি টাকা নিয়ে কেটে পড়েন৷
ক্যানাডিয়ান একটি এনজিওর কার্ড ব্যবহার করতেন৷ সঙ্গে থাকতো হ্যাট পরা লোকজন৷ ড্রোন উড়িয়ে ছবি তুলতেন৷ ঢাকা থেকে শিল্পীদের নিয়ে কনসার্টও করেন৷ আর এসব দেখিয়ে হাতিয়ে নেন গরিব মানুষের দেড় কোটি টাকা৷

তার নাম রুবেল আহমেদ৷ বাস্তবে তিনি অষ্টম শ্রেণি পাস৷ বাড়ি শরিয়তপুরে৷ পরিচয় দিতেন ক্যানাডিয়ান কাউন্সিল ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (সিসিআইসি)-এর বাংলাদেশ প্রধান হিসবে৷ আর তার সর্বশেষ প্রতারণারস্থল কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার বেতবাড়িয়া ইউনিয়ন৷ মাত্র তিন মাসে তিনি ২০০ গরিব মানুষকে ফ্রি পাকা ঘর করে দেয়ার কথা বলে দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নেন৷ শুধু তাই নয় তিনি সেখানে ইংলিশ স্কুল, বাঁধ নির্মাণ আর হাজার কোটি টাকার জলবায়ু প্রকল্পের কাজের কথাও বলেছিলেন৷ প্রকল্পের প্রথম ১৮ কোটি টাকা ব্যয় করার কথা বলেছিলেন৷

প্রথমে তিনি বশে আনেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা বাবুল আক্তারকে৷ ফলে সাধারণ মানুষ সহজেই তাকে বিশ্বাস করে৷

রুবেল আহমেদ
ঢাকার কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম টিম রুবেল আহমেদকে ঢাকার একটি হোটেল থেকে গ্রেপ্তার করেছে ১৮ জানুয়ারি৷ এরপর তার সহযোগী তানজির আহমেদকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ রুবেল প্রতারণার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন৷ তদন্তে আরো প্রতারণার কাহিনি বেরিয়ে আসছে৷

গত অক্টোবরে রুবেল হেলিকপ্টারে করে খোকসায় যান ৷ নামেন স্থানীয় স্কুল মাঠে৷ তাকে রিসিভ করেন বেতবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান বাবুল আক্তার৷ তিনি বলেন, ‘‘এর আগে সে মাগুরার শ্রীপুরে কিছু কাজ করে৷ আমার এক পরিচিত জন তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়৷ সে এখানে এসে ২০০ ঘর, স্কুল ও জলবায়ু প্রকল্পের কাজের কথা বলে৷ গরিব মানুষের ঘর নিয়ে জরিপ করে৷ প্রজেক্ট করার জন্য জমি বায়না করে৷ ঘর তুলে দেয়ার জন্য কাজও শুরু করে৷ ইট, বালু, সিমেন্ট আনে৷ অবিশ্বাসের মতো কিছু ছিল না৷ বিদেশি এনজিওর পরিচয় ১৭ কোটি টাকারও বেশি ফান্ডের কথা বলে৷ এক পর্যায়ে যাদের ঘর করে দেয়া হবে তাদেরসহ আরো মানুষের কাছ থেকে টাকা নেয়৷ তিন মাস এভাবে চলার পর জানুয়ারি থেকে তারা আর আসে না৷’’

তারপর খোকসা থানা ও ঢাকার ঠিকানা ধরে বিমানন্দর থানায় মামলা করেন চেয়াম্যান নিজেই৷

তিনি বলেন, ‘‘আমি ভেবেছিলাম এলাকার গরিব মানুষের উন্নয়ন হবে৷ কিন্তু পরে দেখি প্রতারণা৷ যাদের ঘর ভেঙে ফেলা হয়েছে, তাদের ঘর এখন আমি নির্মাণ করে দিচ্ছি৷ তবে বেশি নয়, পাঁচ-ছয়টি ঘর ভাঙা হয়েছে৷ তবে অনেকে টাকা দিয়েছে৷ তারা আমাকে জানায়নি৷ আলাদাভাবে দিয়েছে৷’’

রুবেল গেলে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনেই থাকতেন৷

ওই গ্রামের আসাদুল ইসলামকেও একটি ঘর করে দেয়ার কথা দিয়েছিল এই প্রতারক চক্র৷ আসাদুল তাদের সঙ্গেই থাকতেন৷ আসাদুল জানান, তারা এলাকায় মিলাদ, কনসার্ট ও আরো কয়েকটি অনুষ্ঠান করেছে৷ তিনি দুইবার রুবেলকে হেলিকপ্টারে আসতে দেখেছেন৷ বাবুল আক্তার জানান, ১৬ ডিসেম্বরও তারা একটি অনুষ্ঠান করেছিল৷ কিছু মুক্তিযোদ্ধাকে সেই অনুষ্ঠানে সম্মাননা দেয়৷

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম টিমের উপ-কমিশনার মাহফুজুল ইসলাম জানান, রুবেলের আরো দুইজন সহযোগী আছে৷ তারা ইন্টারমেডিয়েট পাস হলেও রুবেল অষ্টম শ্রেণি পাস৷ রুবেল নিজেকে ক্যানাডিয়ান কাউন্সিল ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন (সিসিআইসি)-এর বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের টুআইসি পরিচয় দিতো৷ কার্ডও ব্যবহার করতো৷ তাতে বারিধারা রোড, ওয়েব সাইটের ঠিকানা সবই ছিল৷ কার্ডে শুধু সে ওই প্রতিষ্ঠানটির বাড়ি নাম্বারটি ব্যববহার করতো না৷ প্রথমে সে ওই এলাকায় গিয়ে জানায়, লটারির মাধ্যমে ইউনিয়নটি উন্নয়নের জন্য সিলেক্ট হয়েছে৷ মডেল ইউনিয়ন হিসেবে গড়ে তোলা হবে৷

প্রতারকরা সেখানে দুস্থদের জন্য ২০০ ঘর, একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এং নদী ভাঙন এলাকায় জলবায়ু তহবিলের কাজ করবে৷ আর কাউকে কোনো টাকা দিতে হবে না৷ তারা স্কুল বানানোর জন্য অনেক জমি কিনবে উচ্চমূল্যে৷ সেখানে বাইরে থেকে শিক্ষকরা আসবেন৷ তারা অনেক জমি কেনার কাজও শুরু করে৷ এক পর্যায়ে জানায় ফান্ডের ১৮ কোটি টাকা আছে বাংলাদেশ ব্যাংকে ৷ যারা বিভিন্ন কাজে নির্মাণ সামগ্রী বাকিতে দিয়েছে বা যাদের ঘর করে দেয়া হবে, তাদের জানানো হয় ওই টাকা পেতে শতকরা ২.৫ ভাগ ট্যাক্স দিতে হবে৷ ট্যাক্স দিলেই টাকা চলে আসবে, সবাই পাবে৷ এই কথা বলে চক্রটি ওই ইউনিয়ন থেকে মোট দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে মাহফুজুল ইসলাম জানান৷

তিনি বলেন, ‘‘প্রতারকরা তিনবার ওই এলাকায় হেলিকপ্টারে গিয়েছে৷ ড্রোন নিয়ে ভিডিও করেছে৷ ঢাকা থেকে হ্যাট পরা লোকজনকে নিয়ে গেছে৷ ফলে অনেকেই না বুঝতে পেরে লাভবান হওয়ার জন্য আরেকজনকে না জানিয়ে টাকা দিয়েছে৷ প্রতারকরা কাউকে না জানানোর জন্য বলতো৷ ঢাকার উত্তরায় একটি হোটেলে বসেও টাকা নিয়েছে৷ ওই এলাকার লোকজন এখানে এসে টাকা দিয়ে গেছে৷’’

এর আগে তারা মাগুরা, টঙ্গাইল ও খাগড়াছড়ি এলাকায় একইভাবে তারা প্রতারণা করেছেন বলেও তিনি জানান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *